প্রশ্নঃ মেসোপটেমীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কোথায়?
[ বিসিএস ৩৯তম ]
মেসোপটেমীয় সভ্যতা মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। 'মেসোপটেমিয়া' একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ 'দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি'। এই নামটি ইউফ্রেটিস (Euphrates) ও টাইগ্রিস (Tigris) নদীর মধ্যবর্তী উর্বর ভূমিকে নির্দেশ করে, যা বর্তমান ইরাক, সিরিয়া এবং তুরস্কের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত।
সময়কাল: মেসোপটেমীয় সভ্যতার সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে, এবং এটি খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল যখন পারস্য সাম্রাজ্য বাবিল দখল করে।
গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা ও সাম্রাজ্যসমূহ: মেসোপটেমিয়াতে একাধিক সভ্যতা ও সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, যাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব অবদান ছিল:
১. সুমেরীয় সভ্যতা (Sumerian Civilization) - প্রায় ৩৫০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ:
- অবস্থান: মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ অংশ।
- অবদান:
- লিখিত ভাষা: বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত ভাষা 'কিউনিফর্ম' (Cuneiform) আবিষ্কার করেন। এটি ছিল কীলকাকার লিখন পদ্ধতি।
- শহর-রাষ্ট্র: প্রথম শহর-রাষ্ট্রগুলোর (যেমন উর, উরুক, লাগাশ, নিপ্পুর) জন্ম দেন। প্রতিটি শহর-রাষ্ট্রের নিজস্ব শাসক এবং দেবতা ছিল।
- চাকা: চাকার আবিষ্কারের জন্য সুমেরীয়রা বিখ্যাত, যা পরিবহন ও কৃষিতে বিপ্লব এনেছিল।
- সেচ ব্যবস্থা: উন্নত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করেন।
- গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান: ৬০-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাগুলোর বিকাশ ঘটান।
২. আক্কাদীয় সাম্রাজ্য (Akkadian Empire) - প্রায় ২৩৩৪-২১৫৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ:
- প্রতিষ্ঠাতা: সারগন অফ আক্কাদ।
- অবস্থান: মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশ, সুমেরীয়দের উত্তর দিকে।
- গুরুত্ব: এটি ছিল বিশ্বের প্রথম দিকের সাম্রাজ্যগুলোর একটি, যা সুমেরীয় শহর-রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে। আক্কাদীয়রা সুমেরীয় কিউনিফর্ম লিপি গ্রহণ করে এবং সেমিটিক আক্কাদীয় ভাষা ব্যবহার করত।
৩. ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য (Babylonian Empire) - প্রায় ১৮৯৪-১৫৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (প্রাচীন বাবিল) এবং ৬২৬-৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (নব্য বাবিল):
- অবস্থান: মেসোপটেমিয়ার কেন্দ্রীয় অংশ।
- অবদান:
- হাম্মুরাবির আইন সংহিতা (Code of Hammurabi): প্রাচীনতম ও সবচেয়ে সুসংগঠিত লিখিত আইন সংহিতা, যা 'চক্ষুর বদলে চক্ষু' নীতির জন্য বিখ্যাত।
- গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান: উন্নত গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান ছিল। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল।
- ঝুলন্ত উদ্যান (Hanging Gardens of Babylon): নব্য বাবিলীয় সাম্রাজ্যের শাসক নেবুচাদনেজারের সময়কালে নির্মিত এই উদ্যানটি প্রাচীন বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের একটি হিসেবে পরিচিত।
- জিগুরাত (Ziggurat): ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নির্মিত বিশাল পিরামিড-সদৃশ মন্দির।
৪. অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য (Assyrian Empire) - প্রায় ২৫০০-৬১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (বিভিন্ন পর্যায়):
- অবস্থান: মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশ।
- অবদান:
- সামরিক শক্তি: অ্যাসিরীয়রা তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং যুদ্ধকৌশলের জন্য পরিচিত ছিল। তারা লোহার অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করত।
- প্রশাসন: একটি বিশাল এবং সুসংগঠিত সাম্রাজ্য পরিচালনা করত।
- লাইব্রেরি: নিনেভেতে রাজা আশুরবানিপালের বিখ্যাত লাইব্রেরি ছিল, যেখানে হাজার হাজার কিউনিফর্ম ট্যাবলেট সংরক্ষিত ছিল।
মেসোপটেমীয় সভ্যতার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও অবদান:
- নদী নির্ভরতা: ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর পানি কৃষিকাজ ও সেচ ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য ছিল।
- ধর্ম: বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্ম ছিল। প্রতিটি শহর-রাষ্ট্রের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষক দেবতা ছিল।
- স্থাপত্য: জিগুরাত এবং শহরের দেয়াল নির্মাণে তারা সিদ্ধহস্ত ছিল।
- শিল্পকলা: সিলিন্ডার সীল, ভাস্কর্য এবং ধাতব শিল্পে তাদের নৈপুণ্য ছিল।
- আইন ও বিচার: হাম্মুরাবির আইন সংহিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
- শিক্ষা ও সাহিত্য: গিলগামেশের মহাকাব্য (Epic of Gilgamesh) প্রাচীনতম সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মেসোপটেমীয় সভ্যতার উদ্ভাবনগুলো পরবর্তী সভ্যতাগুলোর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে এক বিশাল অবদান রেখেছে।