প্রশ্নঃ ৬ দফা দাবি পেশ করা হয়:
[ বিসিএস ৩৬তম ]
ছয় দফা দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত একটি ঐতিহাসিক কর্মসূচি, যা পরবর্তীকালে বাঙালির মুক্তি সনদ বা ম্যাগনাকার্টা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু এই ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ৭ জুনকে প্রতি বছর '৬ দফা দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
নিচে ছয় দফা দাবির বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
৬ দফা দাবিসমূহ:
১. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:
- ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
- সরকারের ধরন হবে সংসদীয় পদ্ধতির।
- প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সকল আইনসভা গঠিত হবে এবং আইনসভা সার্বভৌম হবে।
- জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিনিধি থাকবে।
২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:
- কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের ক্ষমতা শুধুমাত্র দুটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে: প্রতিরক্ষা (Defence) ও পররাষ্ট্র (Foreign Affairs)।
- অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর (প্রদেশ) হাতে থাকবে।
৩. মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা:
- পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে দুটি অঞ্চলের জন্য দুটি স্বতন্ত্র রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রার পরিচালনা ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে।
- অথবা, একটি মুদ্রা ব্যবস্থা চালু থাকবে, তবে সংবিধানের এমন বিধান থাকতে হবে যাতে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মূলধন পাচার হতে না পারে।
৪. কর বা রাজস্ব বিষয়ক ক্ষমতা:
- সকল প্রকার কর (Tax), খাজনা ও শুল্ক ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকবে।
- প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়সহ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে সংবিধানে নির্দেশিত হারে বা নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেওয়া হবে।
৫. বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:
- ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রাখতে হবে।
- বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারে থাকবে এবং অঙ্গরাজ্যগুলো নিজ নিজ প্রয়োজনে তা ব্যবহার করবে।
- কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, তা সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে আদায় করা হবে।
- দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে, যার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।
৬. আঞ্চলিক মিলিশিয়া ও আধা-সামরিক বাহিনী গঠন:
- পূর্ব পাকিস্তানের কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।
ছয় দফা দাবি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের শোষণমুক্তি ও স্বাধিকার অর্জনের মূল ভিত্তি। এটি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।