প্রশ্নঃ ১৯৫৪ সালের পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্ত ছিলেন না—
[ বিসিএস ৩৮তম ]
১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা পাকিস্তানের রাজনীতিতে এবং বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি ছিল পূর্ব বাংলার প্রথম সরাসরি নির্বাচন যেখানে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিল।
প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান গঠিত হয় এবং পূর্ব বাংলা তার একটি অংশ হয়। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছিল। ভাষার প্রশ্নে (১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন), অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫৩ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
যুক্তফ্রন্ট গঠন: এই নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগের একাধিপত্য ভাঙার লক্ষ্যে পূর্ব বাংলার প্রধান বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে "যুক্তফ্রন্ট" গঠন করে। এই ফ্রন্টে চারটি প্রধান দল ছিল: ১. আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে আওয়ামী লীগ) - নেতা: হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান। ২. কৃষক শ্রমিক পার্টি - নেতা: শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। ৩. নেজামে ইসলাম পার্টি - নেতা: মওলানা আতাহার আলী। ৪. গণতন্ত্রী দল - নেতা: হাজী মোহাম্মদ দানেশ।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানো এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
নির্বাচনী ইশতেহার (২১ দফা): যুক্তফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ঐতিহাসিক "২১ দফা" ঘোষণা করে। এই ২১ দফা ছিল মূলত পূর্ব বাংলার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিল:
- বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা।
- জমিদারী প্রথা বিলোপ করা।
- পাট শিল্পকে জাতীয়করণ করা।
- বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন।
- বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা।
- পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা (প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত)।
- ঐতিহাসিক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা।
নির্বাচনের ফলাফল: ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ভূমিধস বিজয় লাভ করে। মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে (মুসলিম লীগ কোটা) জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পায়, যা তাদের শোচনীয় পরাজয় ছিল। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাকি আসনগুলো পায়।