প্রশ্নঃ অবিভক্ত বাংলার সর্বপ্রথম রাজা কাকে বলা হয়?
[ বিসিএস ৪১তম ]
অবিভক্ত বাংলার সর্বপ্রথম রাজা অশোক তৃতীয় মৌর্য সম্রাট ছিলেন, যিনি পিতা বিন্দুসারের পর সিংহাসন লাভ করেন এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সম্রাট দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ ব্যতীত ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চল শাসন করেন। তাঁকে একজন সর্বভারতীয় সম্রাট বলা যায়। তিনি শুধু বর্তমান ভারত ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো শাসনই করেননি বরং এসব অঞ্চলের সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
Related MCQ
সঠিক উত্তর হল ঘঃ মুসলিম।
মুসলিম শাসকদের আমলেই বাংলাভাষী অঞ্চল ‘বাঙ্গালা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সুলতানি আমলে এই নামটি ব্যাপকতা লাভ করে।
প্রশ্নঃ চীনদেশের কোন ভ্রমণকারী গুপ্তযুগে বাংলাদেশে আগমন করেন?
[ বিসিএস ৪৪তম ]
চীনদেশের যে ভ্রমণকারী গুপ্তযুগে বাংলাদেশে আগমন করেন তিনি হলেন ফা-হিয়েন।
তিনি আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন এবং বেশ কিছু বছর এখানে অবস্থান করেন। এই সময় গুপ্ত সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসন চলছিল। ফা-হিয়েন মূলত বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে ভারতে এসেছিলেন এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করেন। তিনি তার ভ্রমণকাহিনীতে তৎকালীন ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির মূল্যবান বিবরণ রেখে গেছেন। যদিও তার বর্ণনায় সরাসরি "বাংলাদেশ" নামটি পাওয়া যায় না (কারণ তখন এই অঞ্চলের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সংজ্ঞা ছিল না), তবে তিনি পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চল ভ্রমণ করেছিলেন যা পরবর্তীকালে বাংলার অংশ হয়েছিল।
প্রশ্নঃ নঁওগা জেলার অবস্থিত সোমপুর বিহার এর প্রতিষ্ঠাতা কে?
[ বিসিএস ৪২তম ]
সোমপুর বিহার:
- অবস্থান: সোমপুর বিহার বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত। এর অন্য নাম পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার।
- প্রতিষ্ঠাতা ও সময়কাল: পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল দেব (৭৮১-৮২১ খ্রিষ্টাব্দ) অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে, কিছু তিব্বতীয় ইতিহাস অনুসারে দেবপাল (৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এটি নির্মাণ করেন।
- আবিষ্কার: ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই বিশাল স্থাপনা আবিষ্কার করেন।
- ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
- এটি এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহারগুলোর মধ্যে অন্যতম।
- প্রায় ৩০০ বছর ধরে এটি বৌদ্ধদের অতি বিখ্যাত ধর্ম শিক্ষাদান কেন্দ্র ছিল। শুধু উপমহাদেশ নয়, চীন, তিব্বত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও বৌদ্ধরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন।
- খ্রিস্টীয় দশম শতকে এই বিহারের আচার্য ছিলেন বিখ্যাত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।
- এটি পাল যুগের বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, যা পরবর্তীতে বার্মা, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার স্থাপত্যে প্রভাব ফেলেছিল।
- স্থাপত্য:
- বিহারটি একটি বিশাল আয়তক্ষেত্রাকার কাঠামো, যার উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট।
- এর চারদিকে উঁচু প্রাচীর এবং অভ্যন্তরে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ১৭৭টি কক্ষ ছিল এবং প্রায় ৮০০ ভিক্ষু এখানে বাস করতে পারতেন।
- বিহারের কেন্দ্রে একটি শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণ কক্ষ রয়েছে, যা মন্দিরের ভিত্তি থেকে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
- দেয়ালের বাইরের দিকে বুদ্ধমূর্তি, হিন্দুদের দেব-দেবী মূর্তি ও পোড়ামাটির ফলকচিত্র দেখা যায়, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনগাথা চিত্রিত হয়েছে।
- বর্তমান অবস্থা: কালের বিবর্তনে এই বিহারটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে এর ধ্বংসাবশেষ আজও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সোমপুর বিহার শুধু একটি প্রাচীন স্থাপত্য নয়, এটি এক সময়ের জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রশ্নঃ ‘মাৎস্যন্যায়’ বাংলার কোন সময়কাল নির্দেশ করে?
[ বিসিএস ৪১তম ]
'মাৎস্যন্যায়' বাংলার ইতিহাসে একটি অন্ধকার ও অরাজকতাময় সময়কালকে নির্দেশ করে। এটি মূলত সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
এই সময়ে বাংলায় কোনো স্থায়ী ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না। ফলে ছোট ছোট আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং সমাজে জোর যার মুল্লুক তার নীতি প্রচলিত হয়।
'মাৎস্যন্যায়' নামটি এসেছে মাছের জগতের একটি প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে, যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলে। তেমনিভাবে, এই সময়ে শক্তিশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দুর্বলদের উপর অত্যাচার করত এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করত। প্রজারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছিল।
ঐতিহাসিকরা এই সময়কালকে বাংলার ইতিহাসে একটি বিপর্যয়পূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে পাল রাজবংশের উত্থানের মাধ্যমে বাংলায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটে।
সেন বংশের শেষ সফল শাসক লক্ষণ সেন হলেও তিনি সেন বংশের সর্বশেষ শাসনকর্তা নন। কেননা বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমনের পর তিনি নদীয়া থেকে বিক্রমপুরে পালিয়ে যান। সেখানে অল্প কিছু দিন শাসনকার্য চালানোর পর ১২০৬ সালে মৃত্যুবরণ করলে যথাক্রমে তাঁর পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন ১২৩০ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
প্রশ্নঃ প্রাচীন বাংলায় মৌর্য শাসনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
[ বিসিএস ৪০তম ]
প্রাচীন বাংলায় মৌর্য শাসনের বিস্তার খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ঘটেছিল। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ রাজবংশকে পরাজিত করে মগধে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধীরে ধীরে উত্তর ভারত জুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেন।
বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (২৬৯-২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। অশোকের শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, পুণ্ড্রবর্ধন (বর্তমান উত্তরবঙ্গ) মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল এবং এর রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়)।
এছাড়াও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে মৌর্য শাসন আরও দক্ষিণে, যেমন কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ), তাম্রলিপ্ত (হুগলী) এবং সমতট (দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) অঞ্চলেও বিস্তৃত ছিল।
মৌর্য শাসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- রাজনৈতিক ঐক্য: মৌর্যরা প্রথম ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং বৃহত্তর বাংলাকে তাদের শাসনের অধীনে নিয়ে আসে।
- প্রশাসন: তারা একটি সুসংহত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হতো এবং বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী রাজস্ব আদায় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন।
- যোগাযোগ: উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে রাস্তাঘাট নির্মাণ মৌর্য শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
- বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার: সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম বাংলায় বিস্তার লাভ করে। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী লিপিতে এর প্রমাণ মেলে।
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় শুঙ্গ ও কন্ব বংশের মতো কিছু ছোট রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল।